ইউরিক এসিডে কোন খাবার একেবারেই এড়িয়ে চলবেন? জানুন নিষিদ্ধ খাবারের তালিকা

Medically Reviewed By
Dr. Mayanka Lodha Seth
Written By Kirti Saxena
on Nov 6, 2025
Last Edit Made By Kirti Saxena
on Nov 6, 2025

শরীরের ভেতরে খাবার ভাঙার সময় একটি প্রাকৃতিক পদার্থ তৈরি হয়, তার নাম ইউরিক এসিড। মূলত খাবারের মধ্যে থাকা পিউরিন (purine) ভাঙলেই ইউরিক এসিড গঠিত হয়। সাধারণ অবস্থায় কিডনি এই ইউরিক এসিড প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেয়। কিন্তু যখন শরীরে ইউরিক এসিড অতিরিক্ত পরিমাণে জমে যায় বা কিডনি ঠিকমতো বের করতে পারে না, তখন রক্তে এর মাত্রা বেড়ে যায়। এটিকেই চিকিৎসা বিজ্ঞানে বলা হয় হাইপারইউরিসেমিয়া (Hyperuricemia)।
উচ্চ ইউরিক এসিডের ঝুঁকি
শরীরে ইউরিক এসিডের মাত্রা বেড়ে গেলে শুধু গাউট নয়, আরও বেশ কিছু সমস্যা দেখা দেয়। যেমনঃ
- গাউট (Gout): হঠাৎ করে আঙুল বা হাঁটুর জয়েন্টে প্রচণ্ড ব্যথা, লালচে ভাব ও ফোলা দেখা দেয়।
- কিডনির পাথর: অতিরিক্ত ইউরিক এসিড কিডনিতে জমে স্টোন তৈরি করতে পারে।
- জয়েন্টে প্রদাহ: শরীর শক্ত হয়ে যায়, হাঁটা-চলা কষ্টকর হয়।
- হৃদরোগের ঝুঁকি: দীর্ঘদিন ইউরিক এসিড বেশি থাকলে হার্টের সমস্যা ও উচ্চ রক্তচাপের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
সীমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত যে খাবার
সব খাবারই একেবারে নিষিদ্ধ নয়। কিছু খাবার আছে যেগুলোতে মাঝারি মাত্রায় পিউরিন থাকে, তাই সেগুলো একেবারে বাদ না দিয়ে সীমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত।
- মুরগির মাংস: চিকেন বা টার্কিতে পিউরিন থাকে, তবে লাল মাংসের তুলনায় কম। তাই সপ্তাহে এক-দু’বার অল্প পরিমাণে খাওয়া যেতে পারে।
- কিছু সবজি: পালং শাক, ফুলকপি, মাশরুম, মটরশুঁটিতে মাঝারি মাত্রায় পিউরিন থাকে। প্রতিদিন নয়, মাঝে মাঝে খাওয়া যেতে পারে।
- ডাল ও শুঁটি জাতীয় খাবার: রাজমা, ছোলা, ডাল প্রোটিনের ভালো উৎস, তবে ইউরিক এসিড রোগীদের জন্য সীমিত পরিমাণে খাওয়াই ভালো।
যে খাবারগুলো খেতে উৎসাহিত করা হয়
ইউরিক এসিড নিয়ন্ত্রণে রাখতে কিছু খাবার নিয়মিত খাওয়া উচিত, কারণ এগুলো শরীরকে সুস্থ রাখে ও ইউরিক এসিড কমাতেও সাহায্য করে।
- লো-ফ্যাট দুধ ও দই: এতে শরীর প্রয়োজনীয় ক্যালসিয়াম পায় এবং ইউরিক এসিডের মাত্রা কমতে সাহায্য করে।
- ফলমূল: বিশেষ করে ভিটামিন C সমৃদ্ধ ফল যেমন কমলা, লেবু, স্ট্রবেরি ইউরিক এসিড বের করতে সহায়ক।
- সবজি: শসা, গাজর, আলু, ব্রকলি, বিট খাওয়া যেতে পারে। এগুলো শরীরে প্রদাহ কমায়।
- শস্যজাতীয় খাবার: ব্রাউন রাইস, ওটস, গমের রুটি শরীরকে শক্তি দেয় কিন্তু ইউরিক এসিড বাড়ায় না।
- জল: দিনে অন্তত ২–৩ লিটার জল খেলে কিডনি ইউরিক এসিড সহজে বের করতে পারে।
ইউরিক এসিড নিয়ন্ত্রণে লাইফস্টাইল টিপস
শুধু খাবার নিয়ন্ত্রণ করলেই হবে না, দৈনন্দিন অভ্যাসেও কিছু পরিবর্তন আনা দরকার। যেমনঃ
- প্রতিদিন অন্তত ২–৩ লিটার পানি পান করুন, যাতে কিডনি ইউরিক এসিড বের করতে পারে।
- ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন, কারণ অতিরিক্ত ওজন ইউরিক এসিড বাড়ায়।
- প্রতিদিন অন্তত আধা ঘণ্টা হালকা ব্যায়াম বা হাঁটাহাঁটি করুন।
- অ্যালকোহল ও ধূমপান এড়িয়ে চলুন।
- অতিরিক্ত চিনি ও তেলযুক্ত খাবার যতটা সম্ভব কমিয়ে দিন।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
ইউরিক এসিড বেশি হলে অনেকেই প্রথমে গুরুত্ব দেন না। কিন্তু নিয়মিত সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। নিচের পরিস্থিতিগুলোতে অবশ্যই ডাক্তার দেখানো উচিতঃ
- হঠাৎ করে পায়ের আঙুল বা হাঁটুর জয়েন্ট ফুলে যাওয়া ও তীব্র ব্যথা হওয়া।
- বারবার গাউট অ্যাটাক হওয়া।
- প্রস্রাবে জ্বালা বা কিডনিতে ব্যথা অনুভব করা, যা কিডনির স্টোনের লক্ষণ হতে পারে।
- দীর্ঘদিন ইউরিক এসিডের মাত্রা বেশি থাকছে, অথচ কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না।
ইউরিক এসিড বাড়ার প্রধান কারণ
ইউরিক এসিডের মাত্রা সবসময় শুধু খাবারের জন্যই বাড়ে না, আরও কিছু কারণ এর পেছনে কাজ করে। যেমনঃ
- অতিরিক্ত পিউরিনসমৃদ্ধ খাদ্যাভ্যাস – লাল মাংস, সামুদ্রিক মাছ, অ্যালকোহল ইত্যাদি নিয়মিত খাওয়া।
- কিডনির দুর্বলতা – কিডনি ঠিকভাবে ইউরিক এসিড বের করতে না পারলে রক্তে এর পরিমাণ বেড়ে যায়।
- স্থূলতা ও ওজন বৃদ্ধি – অতিরিক্ত চর্বি শরীরের মেটাবলিজমে প্রভাব ফেলে।
- ওষুধের প্রভাব – কিছু ওষুধ যেমন ডিউরেটিকস বা উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ ইউরিক এসিড বাড়াতে পারে।
- বংশগত কারণ – পরিবারের কারও যদি ইউরিক এসিডের সমস্যা থাকে, অন্যদেরও ঝুঁকি বেশি।
উপসংহার
উচ্চ ইউরিক এসিড নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন নয়, যদি আমরা সঠিক খাবার বেছে নেই ও ক্ষতিকর খাবার থেকে দূরে থাকি। লাল মাংস, অ্যালকোহল, সফট ড্রিঙ্ক বাদ দিয়ে ফল, শাকসবজি, লো-ফ্যাট দুধ ও পর্যাপ্ত জল গ্রহণ করলে শরীর অনেকটাই সুরক্ষিত থাকে। একইসঙ্গে নিয়মিত ব্যায়াম ও ওজন নিয়ন্ত্রণ করাও জরুরি। তবে শুধু খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন করলেই চলবে না, সময়মতো পরীক্ষা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই ইউরিক এসিডের মাত্রা জানার জন্য আজই Redcliffe Labs-এ ইউরিক এসিড টেস্ট বুক করুন। সময়মতো পরীক্ষা মানেই সময়মতো চিকিৎসা এবং একটি ব্যথামুক্ত, সুস্থ জীবন।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)
১: ইউরিক এসিডের স্বাভাবিক মাত্রা কত হওয়া উচিত?
উত্তর: পুরুষদের জন্য ৩.৫-৭.২ mg/dL এবং মহিলাদের জন্য ২.৬–৬ mg/dL ইউরিক এসিড স্বাভাবিক ধরা হয়।
২: ইউরিক এসিড বেশি হলে শরীরে কী লক্ষণ দেখা যায়?
উত্তর: জয়েন্ট ফুলে যাওয়া, প্রচণ্ড ব্যথা, বিশেষ করে পায়ের আঙুলে গাউট অ্যাটাক, প্রস্রাবে সমস্যা বা কিডনিতে পাথর ইউরিক এসিড বেড়ে যাওয়ার লক্ষণ।
৩: ইউরিক এসিড কমাতে কোন খাবার খাওয়া উচিত?
উত্তর: লো-ফ্যাট দুধ ও দই, শসা, গাজর, ব্রকলি, কমলা, লেবু, স্ট্রবেরি ও পর্যাপ্ত জল ইউরিক এসিড কমাতে সহায়ক।
৪: ইউরিক এসিড কি একেবারে ওষুধ ছাড়া নিয়ন্ত্রণ করা যায়?
উত্তর: হালকা মাত্রার ইউরিক এসিড খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন পরিবর্তনে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, তবে গুরুতর অবস্থায় অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খেতে হবে।
৫: উচ্চ ইউরিক এসিডে কি সব ধরনের মাছ খাওয়া যাবে না?
উত্তর: সার্ডিন, ম্যাকারেল, অ্যাঙ্কোভি, চিংড়ি, ঝিনুক এড়াতে হবে। তবে মাঝেমধ্যে রুই, কাতলা বা ইলিশও ডাক্তারি পরামর্শে খাওয়া যেতে পারে।
৬: ইউরিক এসিড বাড়লে ডাল খাওয়া কি ক্ষতিকর?
উত্তর: ডাল ও শুঁটি জাতীয় খাবারে মাঝারি পিউরিন থাকে। তাই একেবারে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই, তবে সীমিত পরিমাণে খাওয়াই ভালো।
প্রশ্ন ৭: ইউরিক এসিড বাড়লে কি হাঁটাহাঁটি বা ব্যায়াম করা উচিত?
উত্তর: হাঁটাহাঁটি বা হালকা ব্যায়াম শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ করে এবং ইউরিক এসিড কমাতে সাহায্য করে। তবে তীব্র ব্যথার সময় বিশ্রাম নেওয়া জরুরি।
প্রশ্ন ৮: কতদিন অন্তর ইউরিক এসিড টেস্ট করা উচিত?
উত্তর: যাদের ইউরিক এসিড বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি বা আগে সমস্যা হয়েছে, তাদের নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষার অংশ হিসেবে বছরে অন্তত ২–৩ বার টেস্ট করা উচিত।


